বান্দরবান জেলা পরিচিতি
বান্দরবান পার্বত্য জেলার আয়তন ৪৪৭৯.০৪ বর্গ কিলোমিটার এবং লোকসংখ্যা ৩,০০,৭৪০ জন। এ জেলার রয়েছে দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস। সুদূর অতীতে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল নিয়ে ত্রিপুরা রাজ ও আরাকান রাজের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলার ফলে অঞ্চলটি বহুবার হাত বদল হয়। প্রাচীনকালে পার্বত্য অঞ্চলসহ চট্টগ্রাম ছিল বাংলার হরিকল জনপদের অর্ন্তভূক্ত। ঐ সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন উপজাতীয় বসতি গড়ে উঠেনি। ৫৯০ খ্রিঃ পার্বত্য ত্রিপুরা রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা জুযা রুপা (বীর রাজা) আরাকান রাজাকে পরাজিত করে তার দুই ভাই উদয়গিরি কিলাই এবং মংলাইকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রেরণ করেন এবং তারা মাতামুহুরী নদীর দক্ষিণে পাহাড়ে বসবাস করতে থাকে। ৯৫৩ খ্রিঃ আরাকান রাজ সুলা সান্দ্র চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার দখল করে নেন। ১২৪০ খ্রিঃ ত্রিপুরা রাজা পুনরায় এটিকে উদ্ধার করেন। পরে সুলতানী আমলে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশ বিশেষ ক্রমান্বয়ে সুলতান ফকরুদ্দীন মুবারক শাহ্ (১৩৩৮-১৩৪৯), সুলতান জালাল উদ্দিন মুহামমদ শাহ্ (১৪১৮-১৪৩১), সুলতান ইলিয়াস শাহ্ (১৪৫৯-১৪৭৪), সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্ (১৪৯৩-১৫১৯) এর শাসনাধীন ছিল। ১৫৭১ সাল থেকে এ অঞ্চল আরাকান রাজা মং ফালাউন ওরফে সিকান্দার শাহ্ এর অধীনে ছিল। ১৬৬৬ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম মোগল অধিকারে আসে। ১৭৬০ সালের ১৫ অক্টোবর বাংলার নবাব মীর কাশিম পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ পুরো চট্টগ্রামের দায়িত্ব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে তুলে দেন এবং ১৭৮৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইংরেজদের পূর্ণ কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বৃটিশ শাসনামলে ১৮৬০ সালে ‘রেইন অব ফ্রন্টিয়ার ট্রাইব্স এ্যাক্ট’ অনুসারে চট্টগ্রাম জেলা থেকে পার্বত্য অঞ্চলটিকে (উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে দক্ষিণে মায়ানমারের আরাকান রাজ্য পর্যন্ত) পৃথক করে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামে একটি নতুন পৃথক জেলা সৃষ্টির মাধ্যমে " হিল সুপারিনটেডেন্ট " পদবীতে একজন শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয়। ১৮৯১ সালে স্থানীয় প্রথার সাথে মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়। বর্তমান বান্দরবান জেলাটি বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৮৯১ সালে স্থানীয় প্রথার সাথে মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়। বর্তমান বান্দরবান জেলাটি বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভূক্ত হয়। সার্কেল প্রধানকে বলা হয় সার্কেল চীফ। স্থানীয়ভাবে তারা রাজা নামেও পরিচিত। ১৮০৪ সাল থেকে বান্দরবানে বোমাং রাজাদের কর্মকান্ড শুরু হয়। ১৯০০ সালের মে মাসে ‘দি চিটাগাং হিল ট্রাক্টস রেগুলেশন-১৯০০’ প্রণয়নের মাধ্যমে ডেপুটি কমিশনারকে জেলার প্রশাসনিক প্রধান নিযুক্ত করা হয় এবং সার্কেল চীফ, মৌজা হেডম্যান, কারবারী, রোয়াজা প্রভৃতি পদ সৃষ্টির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব সার্কেল চীফদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। ১৯৫৬ সালে প্রবর্তিত পাকিস্তানের সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘এক্সক্লুডেড এরিয়া’ এর মর্যাদা দেয়া হয় এবং ১৯৬২ সালে তা পরিবর্তন করে ‘ট্রাইবাল এরিয়া’ বলে অভিহিত করা হয়। বর্তমান বান্দরবান পার্বত্য জেলা বৃটিশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার বান্দরবান, নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা ও লামা থানায় অন্তর্ভূক্ত ছিল। সার্কেল অফিসারগণ থানার প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন। ১৯৪৮ সালে বান্দরবান এবং ১৯৭১ সালে লামা থানা পর্যায়ক্রমে মহকুমায় উন্নীত হয়। ১৯৮১ সালের ১৮ই এপ্রিল বান্দরবান মহকুমা ও লামা মহকুমার সমন্বয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা গঠিত হয়। বান্দরবান জেলা নামকরণের একটি বিশেষ কাহিনী রয়েছে। সুদুর অতীতে বর্তমান জেলা সদর অসংখ্য বানরে পরিপুর্ন ছিল। এ বানরগুলো সন্নিকটস্থ নদীর পাড় ধরে সারিবদ্ধ ভাবে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে ফলমুল অন্বেষণে যেত এবং অনুরুপ ভাবে সন্ধ্যায় ফিরে আসত । বানরের সারিবদ্ধভাবে নদীর পাড় দিয়ে পারাপারের এই দৃশ্যটি দূর থেকে বাধেঁর মত মনে হত এবং যা এতদঞ্চলের মারমা সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। একে তারা তাদের ভাষায় ‘ম্যাগসি’ বলত। বাংলায় ‘ম্যাগ’ অর্থ বান্দর (বানর) এবং ‘সি’ অর্থ বাধঁ (বান) অর্থাৎ বান্দরের বাধঁ (বান্দরবান)। সময়ের বিবর্তন এবং ধ্বনি পরিবর্তনের মাধ্যমে বানরের বসবাসকৃত এ স্থানটির নাম বান্দরবান নামে অভিহিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট ১১টি নৃতাত্তিক জাতিগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে। সেগুলো হলো মারমা, চাকমা, মুরং, ত্রিপুরা, লুসাই, খুমি, বোম, খেয়াং, চাক, পাংখো ও তংচংগ্যা। এদের সকলকে এ অঞ্চলের আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও কুকিরাই মূলতঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী। কুকী গোত্রের উপজাতিরা হলো বোম, লুসাই, পাংখো ও খুমি। বান্দরবান জেলার উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠ সম্প্রদায় হলো ‘মারমা’ তাদের সংখ্যা ৭৫,৮৮০জন। তারা মূলতঃ ম্রাইমা নামে বার্মা হতে এসেছে। এ জেলায় চাকমাদের সংখ্যা প্রায় ৬,০০০ জন। রাঙ্গামাটিতে চাকমারা সংখ্যাধিক্য উপজাতি। চাকমাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তারা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত এবং মূলতঃ দক্ষিণ চীনের ইউহানা প্রদেশের আদি অধিবাসী। ১৭৮৪ সালে বার্মা যুদ্ধে চাকমা উপজাতিরা আরাকানের মগদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশে বাধ্য হয়ে এ অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে। বান্দরবানের ২য় বৃহত্তর উপজাতি জনগোষ্ঠী মুরং (ম্রো) সম্প্রদায়। তাদের সংখ্যা ২৮,১০৯ জন। তারা বার্মার আরাকান রাজ্য হতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে খুমীদের সাথে প্রচন্ড সংঘর্ষে পরাজিত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে এসে বসতি গড়ে তোলে। এ জেলায় ৩য় বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হল ত্রিপুরা। তাদের সংখ্যা ১০,৪৭৮ জন। যদিও খাগড়াছড়িতে তাদের সংখ্যা বেশি। ত্রিপুরারা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত। তাদের আদি নিবাস ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। এ জেলায় তংচংগ্যা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৭,০০০ জন। তংচংগ্যা সমাজ চাকমাদের একটি উপশাখা হলেও তারা তা অস্বীকার করে নিজেদের পৃথক জাতীসত্বারূপে মনে করে। এ ছাড়া বান্দরবানে বসবাসরত অবশিষ্ট ০৬টি উপজাতির সংখ্যা মোট ১৪৩৮৯ জন। তন্মধ্যে লুসাই জাতিগোষ্ঠী প্রায় ১৫০ বছর আগে ভারতের মিজোরাম হতে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে সাজেক এলাকায় কেন্দ্রিভূত হয়। খুমীরা সপ্তদশ শতাদ্বীর শেষের দিকে মায়ানমারের আরাকান অঞ্চল হতে আসে। বোমরা সংযুক্ত জাতি। তাদের আদি নিবাস বার্মার ইরাবতী ও চীনদুইন নদীর মধ্যবতী এলাকায়। ১৮৩৮-৩৯ সালের দিকে তারা এ অঞ্চলে আসে। খিয়াংরা অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এ এলাকায় আসে। তারা আরাকানের উমাতাং অঞ্চলে বসবাস করত। চাকরা আরাকান থেকে এ অঞ্চলে আসে। এদের আদীবাস চীনের যুনান প্রদেশে। পাংখোরা ভারতের লুসাই পাহাড় ও মিজোরাম হতে এ অঞ্চলে আসে।ইতিহাস বলে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ উপজাতিই এসেছে পাশ্ববর্তী দেশ বার্মা, চীন, ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা রাজ্য হতে। সে কারণে এ অঞ্চলের উপজাতিয়দের সাথে পাশ্ববর্তী রাষ্ট্রের উপজাতিয়দেরও মিল পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক তথ্য প্রমান থেকে জানা যায় যে, সুপ্রাচীন কাল থেকেই পার্বত্য এলাকায় অ-উপজাতীয় জনগণের বসতি ছিল, যদিও মোঘল সুবেদার শায়েস্তা খাঁর আমলে (১৬৬৬) তাদের দৃপ্ত পদচারণা লক্ষণীয়। ১৭৬০ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল মোগল সম্রাটের অধীন। তখন চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ গোটা এলাকাটির নাম ছিল ইসলামাবাদ। ১৫১৮ সালে বাংলাদেশ ভ্রমনকারী পর্তুগীজ বনিকের বর্ণনামতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলা ভাষাভাষীদের বসবাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বর্তমানে এ জেলায় ৪৭% উপজাতি জনগোষ্ঠী এবং ৫৩% অ-উপজাতি জনগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারত বিভক্তি সম্পন্ন হয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালের সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ এলাকার মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখা হলেও ১৯৬৩ সালে সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে উক্ত বিশেষ এলাকার মর্যাদা বাতিল করা হয়। ১৯৮৯ সালে তিন পার্বত্য জেলায় স্থানীয় সরকার পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে গঠিত জাতীয় কমিটি কর্তৃক উপজাতীয় নেতাদের সাথে বৈঠকের প্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ জেলায় বসবাসরত নৃত্বাত্তিক জনগোষ্ঠির রয়েছে আলাদা আলাদা ভাষা ও সংস্কৃতি। এদের অনেক রীতিনীতি, কৃষ্টি, সামাজিক জীবনাচার ও গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে মহামান্বিত ও বৈচিত্র্যময় করেছে। এক সময়ের প্রচলিত রাজ প্রথা ও রাজ পুণ্যাহ্ অনুষ্ঠান মূলতঃ এ জেলাতেই হয়ে থাকে। এক সময়ের দুর্গম পাহাড়ী বনাঞ্চল বেষ্ঠিত বিপদসঙ্কুল বান্দরবান আজ কোলাহলপূর্ণ বিকাশমান পর্যটন শহর। দেশের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ তাজিংডং (বিজয়), কেওক্রাডাং, মনোমুগ্ধকর চিম্বুক পাহাড়, বিষ্ময়কর প্রাকৃতিক জলাধার বগালেক, প্রান্তিক লেক, পাহাড়ী ঝর্ণাধারা শৈল প্রপাত ও রিজুক, পর্যটন কমপ্লেক্স মেঘলা, নীলাচল এবং মিরিঞ্জার অপরুপ নৈসর্গিক শোভা, বয়ে চলা পাহাড়ী আকাঁ বাকাঁ নদী সাংগু, মাতামুহুরী, রেজু, তারাছা এবং উপজাতীয় জীবন ধারার রহস্যময় হাতছানি, অ-উপজাতি-উপজাতি সমপ্রীতির বৈচিত্র্য পিয়াসী দেশ-বিদেশের ভ্রমন বিলাসী পর্যটকদের যুগযুগ ধরে আকর্ষণ করে চলেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নৃতাত্বিক বৈচিত্র্যের কারনে এ জেলায় ক্রমবিকাশমান পর্যটন শিল্পের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। পাশাপাশি জেলার প্রাকৃতিক সম্পদ তথা পাহাড়ে পরিকল্পিত বনায়ন, ফলের চাষ, চা বাগান, ঝিরিতে বাধঁ দিয়ে মাছ চাষের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম। মূলতঃ বান্দরবান এক অনন্য গিরি জনপদ।





